আমি সেই মানুষ

posted in: নতুন লেখা | 0

আমি সেই মানুষ—

যাকে মানুষ চেনে রাগী, জেদী, খ্যাপাটে বলে; যার চারপাশে ভাসে মারদাঙ্গা আর বিদ্রোহের গুজব।

আমি চোখে চোখ রেখে কথা বলেছি, কারও ভয়ে চোখ নামাইনি কোনোদিন। ক্ষমতার উদ্ধত কলার চেপে ধরেছি, অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি নির্ভয়ে, এমপি, মন্ত্রী, মাস্তান, সন্ত্রাস— কাউকেই ছাড় দিইনি প্রতিবাদের মুষ্টিবদ্ধ উচ্চারণে।

তাই তারা আমাকে ডেকেছে— গুণ্ডা, মাস্তান, সন্ত্রাসী।

কিন্তু একটি নিরপরাধ শিশুর চোখে আমি কোনোদিন ভয় নামাইনি, কোনো নিরীহ মানুষের হৃদয়ে এক ফোঁটা অপমানও রেখে আসিনি।

আমার যুদ্ধ মানুষের বিরুদ্ধে নয়, আমার যুদ্ধ শোষণের বিরুদ্ধে; ধনতন্ত্রের লৌহদরজা, পুঁজিবাদের শকুন-নখর, অমানবিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে।

আমি পদ-পদবি চাইনি, পুরস্কারের চকচকে প্রলোভনে নিজেকে বিকিয়ে দিইনি কখনো।

নিজ স্বার্থে কারও দরজায় হাত পাতিনি, করিনি চাটুকারিতা, মোসাহেবির শৃঙ্খলে নিজেকে বাঁধিনি।

আমি কোনোদিন দলকানা কিংবা দলদাস ছিলাম না।

আমি দাঁড়িয়েছি ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল, রাষ্ট্র— সব ক্ষমতাবানের অন্যায়, দুর্নীতি, ভণ্ডামি, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে।

আমার প্রতিবাদ অনেক সময় আগুন হয়ে উঠেছে।

আমি সেই মানুষ—

যে ভেবেছিল দ্রোহ, বিপ্লব আর সংগ্রামের কবিতা লিখবে, ফসফরাসের মতো জ্বলে উঠবে, ক্ষেপণাস্ত্রের মতো লক্ষ্যভেদী হবে তার শব্দ।

কিন্তু অজান্তেই কলম ভিজে গেছে অশ্রুতে, আর কবিতা হয়ে উঠেছে অসহায় প্রেমের দীর্ঘ স্বীকারোক্তি।

আমি চেয়েছিলাম আষাঢ়ের জোয়ারের মতো আবেগ, করাতকলে চেরা শালগাছের মতো বুকফাটা বেদনা, পরাজয়, বিরহ, শোক আর দুঃখের অসীম আর্তনাদ।

চেয়েছিলাম— ভোরের আলোর মতো কোমল, মাঘপূর্ণিমার জোছনার মতো নির্মল, কুয়াশার মতো স্বচ্ছ কবিতা।

কিন্তু কলমের ডগায় উঠে এসেছে দ্রোহ, প্রতিবাদ, বিপ্লব— রক্ত, বারুদ, আগুন, অস্ত্রের ঝনঝনানি।

আসলে আমার সংগ্রামের কবিতার প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি বর্ণে আমি লুকিয়ে রেখেছি মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, দেশের প্রতি অকৃত্রিম প্রেম।

গণশত্রুর বিরুদ্ধে আমার কবিতা কখনো শানিত তরবারির মতো ঝলসে ওঠে, মলোটভের আগুনের মতো জ্বলে, রকেটের গর্জনের মতো কেঁপে ওঠে।

কিন্তু সেই আগুনের জন্ম নির্যাতিত মানুষের জমে থাকা বেদনা থেকে।

তাই আমার দ্রোহের কবিতা শেষ পর্যন্ত প্রেমে আশ্রয় নেয়, আর প্রেমের কবিতা অজান্তেই হয়ে ওঠে বিপ্লব।

আমি সেই মানুষ—

যার সম্পদ বলতে ঋণ আর দায়, বিত্ত নয়—চিত্ত।

তবু মানুষ ভাবে, আমি নাকি সম্পদের পাহাড়ে বসে আছি!

শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত নারীদের কৌতূহল, গুজব, কুৎসা, অসংখ্য ভুল বোঝাবুঝি আমাকে অনুসরণ করেছে।

কিন্তু সত্যি বলতে— আমি কোনোদিন কারও সম্পূর্ণ হতে পারিনি।

আমার বিবেকের কাছে আমি লাল সাগরের জলের মতো স্বচ্ছ।

জেনে-শুনে কারও ক্ষতি করিনি, অন্যায়ের সঙ্গী হইনি।

আমার জীবন উৎসর্গ করেছি মানুষের জন্য, নিজেকে নিঃশেষ করতে চেয়েছি ভালোবাসার জন্য।

কিন্তু মানুষ প্রায়ই ফিরিয়ে দিয়েছে অকৃতজ্ঞতা, বিশ্বাসঘাতকতা, আর বিষাক্ত বেয়নেটের আঘাত।

আমি সেই মানুষ—

দেশকে ভালোবেসে দেশদ্রোহীর অপবাদ পেয়েছি;

মানুষকে ভালোবেসে অবজ্ঞার পাত্র হয়েছি;

নারীকে ভালোবেসে চোখের জলে ভেসেছি;

কবিতাকে ভালোবেসে হয়েছি নিঃস্ব ফকির।

তবু মানুষ ভাবে— আমি নাকি অহংকারী, ক্ষমতাশালী, দাম্ভিক কোনো চরিত্র!

না—

আমি সেই মানুষ, যাকে মানুষ বরাবরই ভুল বুঝেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *